আমরা চারিদিক টিম ঢাকা থেকে বাস যোগে নোয়াখালীর জেলা শহর মাইজদীতে আসি তারপর মাইজদী থেকে সিএনজি করে সকাল ভোর ৬টায় নোয়াখালীর চেয়ারম্যান ঘাটে আসি। আমাদের উদ্দেশ্য হাতিয়ার নলচিরা ঘাট। সুপ্রিয় দর্শক সিট্রাকে যেতে যেতে আপনাদের সাথে শেয়ার করব নিঝুমদ্বীপের ইতিহাস জানা অজানা নানান কথা।
নোয়াখালী জেলার লোকালয় ও জনপথ থেকে দূরে সাগরের মিতালীতে বঙ্গপসাগরের মাঝখানে ভেশে উঠা দ্বীপ হাতিয়া। এই হাতিয়ার উপকুলে গভীর সমুদ্রে জেগে উঠা এক অনিন্দ্য সুন্দর দ্বীপ ‘’নিঝুম দ্বীপ’’। জেলার দক্ষিনে সুশান্ত সমাহিত নিরবিচ্ছিন্ন নিঝুম পরিবেশে গড়ে উঠা ’নিঝুম দ্বীপ’’ এ দ্বীপটি প্রথম দেখাতেই ভ্রমন পিপাসুদের আকৃষ্ঠ করে গভীরভাবে।
২০০১ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার পুরো দ্বীপটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৩ সালে দ্বীপটি জাহাজমারা ইউনিয়ন হতে পৃথক হয়ে স্বতন্ত্র ইউনিয়নের মর্যাদা লাভ করে। নিঝুম দ্বীপের পূর্ব নাম ছিলো চর-ওসমান,বাউল্লার চর, আবার কেউ কেউ একে ইছামতীর চরও বলত। এ চরে প্রচুর ইছা মাছ, মানে চিংড়ীর মাছ পাওয়া যেত বলে একে ইছামতির চরও বলা হত।
ওসমান নামের একজন বাথানিয়া, তার মহিষের বাথান নিয়ে প্রথম নিঝুম দ্বীপে বসত গড়েন। তখন চর ওসমান নামেই এর নামকরণ হয়েছিলো। পরে হাতিয়ার সাংসদ আমিরুল ইসলাম কালাম, যিনি সাহেব নামে হাতিয়াবাসীর কাছে পরিচিত। তিনি নাম বদলে নিঝুম দ্বীপ নামকরণ করেন। মূলত বাল্লারচর, চর ওসমান, কামলার চর এবং মৌলভির চর – এই চারটি চর মিলিয়ে নিঝুম দ্বীপ। প্রায় ১৪,০৫০ একরের দ্বীপটি ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জেগে ওঠে।
দর্শক ইতোমধ্যে আমরা এসে পৌছেছি হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে। এখন আমাদের গন্তব্য মোক্তারিয়ার ঘাট তারপর নিঝুমদ্বীপ। আমরা পুরো দ্বীপটি ঘুরে ঘুরে দেখবো বলে মুলত হাতিয়া থেকে বাইরোডে যাচ্ছি। যদিও যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। পরিবার পরিজন নিয়ে হাতিয়া থেকে বাইরোডে না আসাই উত্তম। আপনারা চাইলে হাতিয়ার নলচিরা ঘাট থেকে ট্রলার যোগে সরাসরি নিঝুমদ্বীপ আসতে পারেন।
১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জন বসতি গড়ে উঠে। ১৯৭০ এর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপটিতে ব্যাপক প্রাণহানী ও ক্ষয়ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড়ের পরে তৎকালীন হাতিয়ার জননন্দিত নেতা আমিরুল ইসলাম কালাম সাহেব দ্বীপটিতে পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন যে কোন প্রাণের অস্তিত্ব নাই, তাই তিনি আক্ষেপের সুরে বলে ছিলেন হায় নিঝুম! সেখান থেকে দ্বীপটির নতুন নাম নিঝুম দ্বীপ।
এ দ্বীপের মাটি চিকচিকে বালুকাময়, তাই জেলেরা নিজ থেকে নামকরণ করে চর বালুয়া। এই দ্বীপটিতে মাঝে মাঝে বালুর ঢিবি বা টিলার মতো ছিল বিধায় স্থানীয় লোকজন এই দ্বীপকে বাইল্যার ডেইল বা বাল্লারচর বলেও ডাকত। বর্তমানে নিঝুমদ্বীপ নাম হলেও স্থানীয় লোকেরা এখনো এই দ্বীপকে বাইল্যার ডেইল বা বাল্লারচর বলেই সম্বোধন করে। এখানকার জনসংখ্যার বেশিরভাগ বংশ-পরম্পরায় কৃষক ও মৎস্যজীবী বড় বড় বজরা আর সাম্পান নিয়ে এরা যুগ যুগ ধরে সাগরের উত্তাল তরঙ্গে মাছ ধরে বৈচিত্র ময় জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করছে।
বাংলাদেশের বনবিভাগ ৭০-এর দশকে বন বিভাগের কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চার জোড়া হরিণ ছাড়ে। নিঝুম দ্বীপ এখন হরিণের অভয়ারণ্য। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের হরিণ শুমারি অনুযায়ী হরিণের সংখ্যা ২২,০০০। নোনা পানিতে বেষ্টিত নিঝুম দ্বীপ কেওড়া গাছের অভয়ারণ্য। ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে সুন্দরবনের পরে নিঝুম দ্বীপকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বলে অনেকে দাবি করেন। নিঝুম দ্বীপ প্রায় ৯১ বর্গ কিমি আয়তনের নিঝুম দ্বীপে ৯টি গুচ্ছ গ্রাম রয়েছে। ১৯৯৬ সালের হিসাব অনুযায়ী নিঝুম দ্বীপ ৩৬৯৭০.৪৫৪ হেক্টর এলাকা জুড়ে অবস্থিত। বর্ষা মৌসুমে ইলিশের জন্য নিঝুম দ্বীপ বিখ্যাত। এই সময় ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা নিঝুম দ্বীপে মাছ কিনতে আসে। এছাড়া শীত কিংবা শীতের পরবর্তী মৌসুমে নিঝুম দ্বীপ চেঁউয়া মাছের জন্য বিখ্যাত। জেলেরা এই মাছ ধরে শুঁটকি তৈরি করেন। এই শুঁটকি মাছ ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারদের কাছে বিক্রি হয়।
নিঝুম দ্বীপে রয়েছে ৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থিত। নিঝুম দ্বীপে পর্যটকদের জন্য রয়েছে অবকাশযাপ কেন্দ্র, এখানে এখানে থাকাও শতভাগ দেশিয় খাবার পাওয়া যায়। আর মেঘনার ইলিশ তো থাকছেই। নিঝুম দ্বীপে বেশ কয়টি ডাকবাংলো, হোটেল ও রিসোট আছে। নিঝুম দ্বীপে বেড়াতে এলে আপনি হারিয়ে যাবেন প্রকৃতির কাছে।


