১৯৪৬ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট এই চার মাস নোয়াখালীতে ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। শান্তি মিশনের অংশ হিসেবে ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি নোয়াখালী জেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে বেগমগঞ্জ উপজেলার জয়াগ গ্রামে আসেন গান্ধীজি। শান্তি মিশনের অংশ হিসেবে গান্ধীজি ৪৭টি গ্রামে ভ্রমণ ও প্রার্থনা সভার আয়োজন করেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ক্ষত, ক্ষোভ দূর করতে সব সম্প্রদায়ের মানুষদের সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
গান্ধীজির আগমণ উপলক্ষে ততকালীন স্থানীয় জমিদার এবং নোয়াখালী জেলার প্রথম ব্যারিস্টার হেমন্তকুমার ঘোষ তাঁর নিজের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি মহাত্মা গান্ধীকে দান করেন। সেখান থেকেই তিনি ‘অম্বিকা-কালীগঙ্গা দাতব্য ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারত স্বাধীন হওয়ার এক বছর আগে, ১৯৪৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে নোয়াখালীতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়, যা নোয়াখালী দাঙ্গা নামেও পরিচিত। এই দাঙ্গার ঘটনাটি ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের এক মর্মান্তিক এক অধ্যায়।
এই ঘটনার পর ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী এই পুরো অঞ্চলটি বেশিরভাগ পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। হিন্দু-মুসলমান সমাজের নানা অংশের সাথে কথা বলেন এবং বিভিন্ন জনসভায় গিয়ে ভাষণ দেন। এই হানাহানি বন্ধ করে দুর্বলকে রক্ষা করাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।
নোয়াখালীতে সফরকালে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে ঘটে যায় একটি ঘটনা ।
গান্ধী ছাগলের দুধ অনেক পছন্দ করতেন। তাই সাথে করে ছাগল এনেছিলেন তিনি। কিন্তু নোয়াখালীতে আসার পরই, তার একটি ছাগল চুরি হয়ে যায়। জানা যায়, চাটখিলের বৈঠকের আগে কাশেম ফৌজের লোকজন ছাগলটি চুরি করে এবং ওই বৈঠকে সেই ছাগলের মাংস রান্না করে, নিরামিষাশী গান্ধীর সামনে পরিবেশন করে! যদিও ইতিহাসে গান্ধীজির কোন লিখায় এ ধরনের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
নোয়াখালী ভ্রমনের ছবি


১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে উগ্রবাদী নাথুরাম গডসের হাতে খুন হন মহাত্মা গান্ধী। এরপর কয়েকজন বাদে গান্ধীর অধিকাংশ অনুসারীই নোয়াখালী ছেড়ে যান। যারা থেকে গিয়েছিল, তাদের ওপর নেমে আসে পাকিস্তান সরকারের কড়াঘাত। অধিকাংশ অনুসারীকেই গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ট্রাস্টের সম্পত্তি লুট করাসহ জমি দখল করে স্থানীয় সুযোগসন্ধানীরা।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর শান্তি মিশনের টিম ম্যানেজার চারু চৌধুরী কারাগার থেকে মুক্তি পান। স্বাধীন দেশে আবারও আশ্রমটি পুনর্প্রতিষ্ঠা করার কাজ শুরু করেন তিনি। আশ্রমের দখল হয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের জারি করা গ্যাজেটের পর আশ্রমটি অসাম্প্রদায়িক ও অরাজনৈতিক জনকল্যাণমূলক সংস্থায় পরিণত হয়। এসময় ‘আম্বিকা কালীগঙ্গা দাতব্য ট্রাস্ট’ বদলে আশ্রমের নাম রাখা হয় ‘গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট’।

ট্রাস্টের কার্যক্রম পরিচালনায় বাংলাদেশ ও ভারত দু’দেশের সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী একটি কমিটি গঠিত হয়। স্বাধীনতার পর ট্রাস্টের দৃষ্টিভঙ্গি, উদ্দেশ্য ও কর্মকাণ্ডে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের লক্ষ্যে আশ্রমটি কাজ করতে শুরু করে।
এ আশ্রমটি দেখার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন অনেক পর্যটক ভিড় জমান। এমনকি এখনও ভারতের কংগ্রেস দলের কোন নেতা-নেত্রি বাংলাদেশে আসলে ভিজিট করেন গান্ধী আশ্রম। সর্বশেষ মহাত্মা গান্ধীর ১৫৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নোয়াখালীতে ঐতিহাসিক গান্ধী আশ্রম পরিদর্শন করেছেন ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা।

