কম খরচে এবং কম সময়ে যোগাযোগের নিরাপদ ও আরামদায়ক মাধ্যম হিসেবে দেশে রেল যোগাযোগ সুপরিচিত। বাংলাদেশে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর বর্তমান চুয়াডাঙ্গার দর্শনা হতে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত ৫৩.১১ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপিত হয়। বিগত প্রায় ১৬০ বছর যাবত এ স্টেশনটি দেশের পশ্চিমাঞ্চলের মানুষদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে দেশের রেলওয়েকে আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ ষ্টেশন বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলায় অবস্থিত একটি রেলওয়ে ষ্টেশন।
ঘোড়াশাল ফ্যাগ ষ্টেশনটি বাংলাদেশের প্রথম দ্বিতল বা দোতলা রেলওয়ে ষ্টেশন। জানা যায়, ১৮৯২ সালে ইংল্যান্ডে গঠিত আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি এদেশে রেলপথ নির্মানের দায়িত্ব নেয়। পরবর্তীতে অন্যান্য ষ্টেশনের ন্যায় ১৯১০ সালে ঘোড়াশাল রেলওয়ে ষ্টেশনটি স্থাপন করা হলেও আজকের ফ্ল্যাগ ষ্টেশনটি ১৯১৪ সালে স্থাপন করা হয়। ঘোড়াশালের ততকালীন জমিদার হাজী মোহাম্মদ আবু সাঈদ (সাজদা মিয়া) জমিদারীর পাশাপাশি ব্রিটিশ সরকারের মনোনীত একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সেই সুবাদে ঘোড়াশাল থেকে রেলপথে তাকে ঢাকায় যেয়ে অফিস করতে হতো। পার্শ্ববর্তী কালীগঞ্জ কাপাসিয়া এবং চরসিন্দুরের লোকজনকেও নদী পথে এসে ঘোড়াশালের এই স্টেশনে রেলপথে যাতায়াতের জন্য ব্যাবহার করতে হতো। কিন্তু শীতলক্ষ্যা নদীর পার থেকে ষ্টেশনটির দূরত্ব ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার। নদীপথে এসে পায়ে হেঁটে যাত্রীদের ষ্টেশনে আসাযাওয়াটা খুবই কষ্টসাধ্য ছিল। সেইদিক বিবেচনা করে শীতলক্ষ্যা নদীর পারে আরেকটি রেলওয়ে ষ্টেশন স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ সরকারের নিকট লিখিত আবেদন জানান জমিদার সাজদা মিয়া। তার এই আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৯১৪ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি দ্বারা নির্নিত হয় বর্তমান ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ ষ্টেশন। এই বিষয়ে ঘোড়াশাল দক্ষিণ চরপাড়ার কোরবান আলী জানান, তখন ষ্টেশনের এই ঘরটি চারদিকে মুলিবাঁশ ও উপরে ছিল টিনের চালা। নিচে টিকেট বিক্রি করার জন্য ছিল টিকেট ঘর, আর উপরে ছিল বিশ্রামাগার। রেলগাড়িতে থাকতো জমিদার সাহেবের জন্য নির্ধারিত একটি কামরা। ফ্ল্যাগ ষ্টেশনের পুরাতন স্থাপত্যটি গত এরশাদ সরকারের আমলে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হলেও জমিদার আহমদুল কবির মনু মিয়ার বাধার কারণে তা ভাঙতে পরেননি। ঘোড়াশাল টেকপাড়া গ্রামের আব্দুল হাই খান জানান, সাজদা মিয়া ছিলেন ঘোড়াশাল অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো জমিদার। ষ্টেশনটি তার জন্যই হয়েছে। যেদিন ঢাকা যেতেন, সংবাদটি আগেই রেলওয়ে কোম্পানিকে জানানো হতো। গাড়ী থামিয়ে রেলওয়ে কোম্পানির লোক বাড়িতে এসে বলতেন জমিদার সাহেবের জন্য গাড়ী থামিয়ে রাখা হয়েছে। তখন তিনি পালকিতে চড়ে ষ্টেশনে যেতেন। পালকির আগে পিছে থাকতেন ৩ জন করে ৬ জন ঋষি, আঞ্চলিক ভাষায় যাদেরকে বলা হয় “মাওরা”। সাহেবকে ষ্টেশনে আনা-নেওয়ার জন্য তাদেরকে প্রস্তত রাখা হতো। মুলতঃ জমিদার সাজদা মিয়ার জন্যই ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ ষ্টেশনটি করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ঘোড়াশাল গ্রামের হযরত আলীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ততকালীন ব্রিটিশ সরকারের সাথে জমিদার সাজদা মিয়ার ছিল খুবই সুসম্পর্ক। আর এই জন্যই মাত্র ১ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে আরেকটি ফ্ল্যাগ ষ্টেশনটি স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। যেদিন অফিসের কাজে ঢাকা যেতো, চট্টগ্রাম থেকেই জমিদার সাহেবের জন্য একটি কামরা বরাদ্দ থাকতো। জমিদার ছাড়া আর কেউ এই কামরাটিতে উঠতোনা। ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ রেলওয়ে ষ্টেশনটির ঐতিহ্যকে ধরে রাখার দাবি স্থানীয়দের। পাশাপাশি ১ শত ৮ বছরের পুরনো এই ঐতিহাসিক নিদর্শন গুলো রক্ষণা বেক্ষণের মাধ্যমে এটিকে পর্যটন মন্ত্রনালয়ের অধীনে নিয়ে পর্যটন এলাকায় রুপান্তরিত করতে সরকারের কাছে সর্ব মহলের দাবী। প্রতিদিন বিশেষ করে যেকোনো ছুটির দিনে নরসিংদী জেলা ছাড়াও পার্শ্ববতী গাজীপুর, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা আসেন অবসর সময় কাটাতে। এখানে দুটি রেলওয়ে সেতুও রয়েছে এবং আসা যাওয়ার রাস্তা গুলোর সৌন্দর্য বর্ধণ করা হয়েছে। রয়েছে প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্য, যা দেখলে যে কারো মন জুড়াবে।


