চৌমুহনী বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য কেন্দ্র ও শহর। ব্রিটিশ শাসনামলে এ বাণিজ্যকেন্দ্রটি গড়ে উঠলেও এর সঠিক বয়সসীমা কারোরই মনে পড়ে না। নোয়াখালী খাল, ছাতার পাইয়া খাল, ফেনী খাল ও পৌরন বিবি খাল তথা চার খালের মোহনায় এ বাণিজ্য কেন্দ্রটি গড়ে ওঠায় এর নাম রাখা হয়েছিল চৌমুহনী। ফলে নৌযানই ছিল এখানকার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। এসব স্থান থেকে বড় বড় সাম্পান ও ডিঙ্গি নৌকায় মাল বোঝাই করে চৌমুহনী আসতো। এখানে ৬টি নৌকাঘাট ছিল। বর্তমানে দখলদারদের কবলে পড়ে একটি ঘাটও নেই। খাল ভরাট করে দোকানপাট এমনকি বহুতল ভবন নির্মাণ করায় নৌ-যোগাযোগ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। রেল যোগাযোগ ছিল অনেক উন্নত। প্রতিদিনই মালবাহী গাড়ি আসতো। চৌমুহনী সরকারি খাদ্যগুদামে কয়েকশ শ্রমিক কাজ করতো।
এটি বেগমগঞ্জ উপজেলার প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র। শহরটি নোয়াখালী জেলার সবচেয়ে বড় ও উন্নত শহর।
পূর্বে দেশীয় ও ভারতীয় মারোয়াড়ীদের বড় বড় দোকানপাট ও ব্যবসা ছিল। চৌমুহনীর সঙ্গে দেশের নদী বন্দর চাঁদপুর, ভৈরব, নারায়ণগঞ্জ সহ বিভিন্ন স্থানের সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ ছিল। কলকাতা থেকে নদীপথে বড় বড় সওদাগরি নৌকায় এখানে আসত বিভিন্ন পণ্য। আর নৌকাবোঝাই পাট যেত কলকাতায়। ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের গদিতে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সন্ধ্যার পর পাইকারদের লম্বা লাইন পড়ে থাকত। পাট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চৌমুহনীতে গড়ে উঠেছিল ডেল্টা জুট মিল। আমিন জুট মিল এবং বর্তমানে বিলুপ্ত এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিলের পাট ক্রয় কেন্দ্রও ছিল চৌমুহনীতে। ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে উঠেছিল পাটের বেল মেশিন। আড়তদাররা তাদের পাট বেল করে তা মিলে সরবরাহ করতেন।
রেল যোগাযোগ ছিল অনেক উন্নত। রেল সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের (বর্তমানে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) মধ্যে বাণিজ্যিক দিক দিয়ে চৌমুহনী রেলস্টেশন প্রথম স্থান অর্জন করেছিল। রেল বিভাগের চৌমুহনীতে ৪০ একর জায়গা রয়েছে। বর্তমানে স্টেশন ভবন ও রেললাইন ছাড়া কোন জায়গা রেলের হাতে নেই। এমনকি রেলওয়ে কোয়ার্টারও বহিরাগতদের দখলে।
চৌমুহনীতে বিসিক শিল্প নগরীতে ৭৪টি শিল্পকারখানা চালু রয়েছে। এছাড়া শহরে ২২টি বড় আটা কল ছাড়াও শতাধিক ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে। চৌমুহনীতে রয়েছে ডেলটা জুট মিল লিঃ। এছাড়া এখানে প্রায় ১০ হাজার দোকানপাট রয়েছে।
এখানে দেশের প্রায় সব ব্যাংকের শাখা রয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ব্যাংকের তিনটি শাখাও রয়েছে। প্রতিদিন এখানে কোনো কোনো ব্যাংকের শাখায় ১৫০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়। এমন তথ্য ব্যাংকারদের।
তেলশিল্পের জন্য বিখ্যাত চৌমুহনী । ১৯৪৯ সালে উপেন্দ্র কুমার সাহা চৌমুহনীতে শ্রী গোপাল অয়েল মিল (লাড্ডু গোপাল) স্থাপন করেন। পরে চৌমুহনীতে ৩২টি তেলের মিল স্থাপিত হয়। চৌমুহনীর তেল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানেও রপ্তানি হতো। বিভিন্ন সমস্যায় বেশির ভাগ তেলের মিল বন্ধ হয়ে গেলেও বর্তমানে কয়েকটি চালু রয়েছে।


প্রকাশনা শিল্পে ঢাকার বাংলাবাজারের পর দ্বিতীয়তম বাজার ছিল নোয়াখালীর চৌমুহনীতে।
চৌমুহনীর ইসলামিয়া লাইব্রেরি ১৯৩৯ সালে ধর্মীয় প্রকাশনায় হাত দেয়। এর পর ১৯৪৫ সালে মৃত চিত্ত রঞ্জন সাহা চৌমুহনীতে বাসন্তি প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তিনি পুঁথিঘর প্রতিষ্ঠা করে প্রকাশনা শুরু করেন। পুঁথিঘর থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক হরলাল রায়ের “বাংলা ব্যাকরণ ও রচনা” দেশব্যাপী ছাত্রছাত্রীদের নিকট সমাদৃত ছিল। দেশের প্রকাশনা জগতে চৌমুহনী একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রেখেছে। পরবর্তী সময়ে বই প্রকাশনী, পপুলার লাইব্রেরি, রেখা প্রকাশনী, কলকণ্ঠ প্রকাশনী, মিনার প্রকাশনী, বই প্রকাশনী, বাংলাদেশ প্রকাশনী, সাহিত্য ভবন, মিতা প্রকাশনী আজিজিয়া লাইব্রেরিসহ অনেক প্রকাশনা সংস্থা পুঁথিঘরের মাধ্যমে শুরু হওয়া যাত্রাকে সমৃদ্ধ করেছে।
মুদ্রণ শিল্পে এখনো ছাপাখানার জন্য এ অঞ্চলে বিখ্যাত চৌমুহনী। চৌমুহনীতে প্রায় একশ’ অফসেট প্রেস রয়েছে। বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রথম অফসেট প্রেস এখানেই স্থাপিত হয়। চৌমুহনীতে বিসিক শিল্প নগরীতে ৭৪টি শিল্পকারখানা চালু রয়েছে, আরো কয়েকটি চালুর অপেক্ষায় আছে। এছাড়া শহরে ২২টি মেজর ফ্লাওয়ার মিল ছাড়াও শতাধিক ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে। চৌমুহনীতে রয়েছে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডেলটা জুট মিল লিঃ। এছাড়া প্রায় ১০ হাজার দোকানপাট রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা:
বৃহত্তর নোয়াখালীতে ফেনী কলেজের পর চৌমুহনী কলেজ স্থাপিত হয় ১৯৪৩ সালে। পরবর্তীতে কলেজটি ১৯৮৬ সালে সরকারিকরণ হয়। উক্ত কলেজে বর্তমানে ১১ বিষয়ে সম্মান শ্রেণী রয়েছে। আরো ৪ বিষয়ে সম্মান শ্রেণী চালুর প্রক্রিয়া রয়েছে। কৃষি প্রশিক্ষায়তন, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সরকারি কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়াও বেসরকারি বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বেগমগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় এসএসসি পরীক্ষায় জেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে।
ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক:
পাক আমলে শেরেবাংলা কাপ জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় জেলা দলের ১১ জনের মধ্যে ৬ জনই ছিল চৌমুহনী তথা বেগমগঞ্জের। স্বাধীনতা-উত্তর কালেও জাতীয় নাট্য প্রতিযোগিতায় চৌমুহনীর কোন নাট্য গোষ্ঠী জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করতো। রাজনীতি-বাণিজ্যিক দিক দিয়ে যেমন চৌমুহনীর ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনি রাজনীতির দিক দিয়েও বৃহত্তর নোয়াখালীর মধ্যে চৌমুহনীর গুরুত্ব ছিল প্রথমে।

