আকাশের রাজা বাজপাখি। এরা দুর্ধর্ষ শিকারি। প্রায় ৪০ প্রজাতির বাজপাখি রয়েছে। এন্টার্কটিকা ছাড়া বিশ্বের সব মহাদেশেই এদের দেখতে পাওয়া যায়। এদের ডানা পাতলা এবং অগ্রভাগের দিকে ক্রমশ সরু যার ফলে এরা অনেক দ্রুতগতিতে উড়তে এবং গতিপথ দ্রুত বদলাতে পারে। বাজপাখির বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে গায়ার ফ্যালকন সবচেয়ে বড়। এরা ৬৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। সবচেয়ে ছোট আকারের হলো কেসট্রেল। মাত্র ২৫ সেন্টিমিটার। শিকারি পাখিদের মধ্যে বাজের দৃষ্টিশক্তি অসাধারণ। এদের দর্শন শক্তি একজন স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় আড়াই থেকে আটগুণ বেশি।
পেরেগ্রিন বাজের ডাইভ করার গতি ঘণ্টায় ২৪০ মাইল বা ৩৮৪ কিলোমিটার যার জন্য এদের বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রাণী বলা হয়। মানুষ যেসব প্রাণী তীর ছুড়ে বধ করতে বা ফাঁদ পেতে ধরতে পারে না সেগুলো শিকারের কাজে দীর্ঘদিন ধরে বাজপাখি ব্যবহার করে আসছে। তবে কবে থেকে শিকারিবাজদের ধরে এনে পোষ মানা ও ট্রেনিং দেয়া শুরু হয়েছে ইতিহাসে তার রেকর্ড নেই। ‘দি এপিক অব গিলগামেশ’-এ উল্লেখ আছে যে, বাজপাখি পোষ মেনে শিকারের কাজে ব্যবহার করার প্রথাটি সেই চার হাজার বছর আগে আজকের ইরাক অঞ্চলে চালু ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই প্রথার বিস্তার ঘটতে ঘটতে বিশ্বের সমস্ত সমাজেই ছড়িয়ে পড়েছে। রাজা তুতকে বাজপাখির প্রতিকৃতির দুল পরিয়ে সমাহিত করা হয়েছিল। গ্রীকদের ব্যবহৃত মুদ্রায় দেবতাদের রাজা জিউস ও একটা বাজপাখির প্রতিকৃতি শোভা পেত। নরওয়ের ব্যবসায়ীরা আইসল্যান্ড থেকে বাজপাখি এনে গোটা ইউরোপে বিক্রি করত।

ঈগলের মতো শিকারি হিংস্র এই বাজপাখি । দিনের আলোতে শিকার করে। ধারালো নখ দিয়ে অন্যান্য পাখ-পাখালি, পোকা-মাকড়, মাছ ও কীট-পতঙ্গ শিকার করে খায়।সে গগনচুম্বী উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় বসবাস করাকে এবং একা থাকতে পছন্দ করে। সে নিজে কামাই ও পরিশ্রম করে খায়, অন্যের খাবার ছিনতাই করে না। বাজপাখি অত্যন্ত ক্ষীপ্রগতিসম্পন্ন হিংস্র পাখি। খুবই ধৈর্যশীল শিকারি। কষ্টসহিষ্ণু। দীর্ঘসময় ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করে যায় নিরবে। তার দৃষ্টিশক্তি বড়ো প্রখর। চোখ দু’টো খুবই কমনীয়। তার শক্তি, বুদ্ধি ও বীরত্ব প্রশংসনীয়। এ- তো গেল বাজপাখির কতিপয় গুণ, কিন্তু বাজপাখিকে ঘিরে এমন একটা চমকপ্রদ কথা রয়েছে- তা কি আমরা জানি? বাজপাখি যখন চল্লিশের কোঠায় পৌঁছে তখন সে কী করে- জানেন? তাহলে চলুন শুনে নেয়া যাক- বলা হয়, বাজপাখি সত্তর বছর পর্যন্ত বাঁচে। কিন্তু এই দীর্ঘজীবন পেতে হলে তাকে একটা কঠিণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। কী সেই সিদ্ধান্ত? বাজপাখি চল্লিশের কোঠায় পদার্পণ করার পর তার নখের শক্তি হারিয়ে ফেলে, নখ দিয়ে কোনোকিছু ধরতে সে অপারগ হয়ে যায়, যা তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম। ইস্পাতের মতো তার ধারালো ঠোঁটটি বেঁকে যায়, সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বয়সের ভারে তার ডানাদ্বয় খুবই ভারি হয়ে ওঠে। ডানার পালকগুলো ভারি হয়ে সিনার সঙ্গে লেপ্টে যায়। তার জন্য গগনে গুঁতো দিয়ে ওড়া ভারি মুশকিল হয়ে পড়ে। তার সামনে কষ্টসাধ্য দু’টি পথ খোলা থাকে। হয়তো মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকবে অথবা ছয়মাসের জন্য নিজেকে বদলে ফেলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করবে। বাজপাখি কোনটা গ্রহণ করে? গগনচুম্বী পাহাড়ের চূড়া, যেথায় বাজপাখির নীড়; শতকষ্ট করে হলেও সেথায় ওড়াল দেয়। চূড়া-র কোনো পাথরে ঠুকরিয়ে ঠুকরিয়ে তার বেঁকেযাওয়া অথর্ব ঠোঁটটি ভেঙ্গে ফেলে, অতঃপর অপেক্ষা করতে থাকে যতক্ষণ না নতুনভাবে আবার ঠোঁট গজিয়ে ওঠে। এভাবে সে তার শিথিল নখগুলোকেও ভেঙ্গে ফেলে, অতঃপর নতুনভাবে আবারো নখ গজিয়ে ওঠার অপেক্ষা করতে থাকে। তদ্রুপ সে তার ডানার ভারি পালকগুলোকেও উপড়িয়ে নেয়, অতঃপর নতুনকরে গজিয়ে ওঠার অপেক্ষা করতে থাকে। আর এভাবেই গত হয়ে যায় ছয়মাস। অতঃপর আরো ত্রিশ বছর দীর্ঘায়ু লাভ করে। যখনই মানুষের জীবন দিয়ে কোনো চিন্তা অথবা বিপদ অতিক্রম করে, মানুষ হাহুতাশ করতে শুরু করে বা একেবারে ভেঙ্গে পড়ে। অথচ, মানুষের জন্য ভেঙ্গেপড়া মোটেই উচিৎ নয়; বরং নবোদ্যমে আগে বাড়তে হবে, আত্মসমর্পণ করা চলবে না। সর্বোপরি বাজপাখি থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
তোমার পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাও… বাজপাখির মতো হও…. আশার আকাশে ওড়ে বেড়াও…… জীবনের নবসঞ্চার ঘটাও….


