গিরিশচন্দ্র সেন, একজন অমুসলিম হয়েও যিনি বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের মধ্যে অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। মূলত গিরিশচন্দ্র সেন নামেই অধিক পরিচিত তিনি, তাঁর প্রধান পরিচয় ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন-এর প্রথম বাংলা অনুবাদক হিসেবে। নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামের ড্রিম হলিডে পার্ক সংলগ্ন মেহেরপাড়ায় অবস্থিত ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ি । বাড়িটি অনেকদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় ২০১৬ সালে ভারতীয় কমিশনারের অনুদানে মূল বাড়ির কাঠামো ঠিক রেখে পুনর্নির্মাণ করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
ঐতিহ্য অন্বেষণ সূত্রে জানা গেছে, মূল অবকাঠামো অক্ষুন্ন রেখে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মেরামত ও সংরক্ষণের এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা ব্রিটিশ আমলের মূল্যবান কাঠ, আসবাবপত্র ও যশোরের টালি। এ ছাড়া, ঐতিহ্য অন্বেষণের নিজ উদ্যোগে উয়ারী-বটেশ্বর এলাকায় তৈরি করা একটি বিশেষ আয়তনের ইটও ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া বাড়ির সামনে স্থাপন করা হয়েছে গিরিশ চন্দ্র সেনের সংক্ষিপ্ত জীবনী সহ একটি আবক্ষ মূর্তি। গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়িতে বর্তমানে জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে।
জাদুঘরে গিরিশ চন্দ্র সেনের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, বাস্তুভিটায় আবিষ্কৃত প্রত্নতত্ন এবং তাঁর লেখা বই সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহের রবিবার ব্যতিত অন্য ৬ দিন গিরিশ চন্দ্র জাদুঘর সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল যে, মূলভাষা থেকে অনূদিত হলে গ্রন্থটির পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হবে। পবিত্র কুরআন সম্পর্কেও এমন ধারণা ছিল। এ কারণে অনেক মুসলিম মনীষী এর বঙ্গানুবাদ করতে সাহস পাননি। গিরিশচন্দ্র সেন অন্য ধর্মালম্বী হয়েও এই ভয়কে প্রথম জয় করেন। শুধু কুরআন শরীফের অনুবাদ নয় তিনি ইসলাম ধর্ম বিষয়ক অনেক গ্রন্থ অনুবাদ করেন। তিনি ইসলাম ধর্ম নিয়ে অনেক গবেষণাও করেন। ১৮৩৪ সালে নরসিংদী জেলার পাচদোনা গ্রামে জন্ম এক বিখ্যাত দেওয়ান বৈদ্যবংশে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন মাধবরাম সেন এবং পিতামহ ছিলেন রামমোহন সেন। পেশাগত জীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি ময়মনসিংহের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাচারিতে নকলনবিশ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে স্বল্প সময়ের জন্য ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে শিক্ষকতা করে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রথম পর্যায়ে তিনি ঢাকা প্রকাশে কাজ করেন এবং এতে তার লেখা প্রকাশিত হয়। পরে তিনি সুলভ সমাচার ও বঙ্গবন্ধু পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক এবং মাসিক মহিলা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে গিরিশচন্দ্র কলকাতায় গমন করেন। কলকাতায় যাওয়ার পর তার সাথে দেখা হয় রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের তৎকালীন প্রচারক কেশবচন্দ্র সেনের। সে সময় কেশবচন্দ্র ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের নববিধান শাখার প্রধান। তারই প্রভাবে গিরিশচন্দ্র সেন ব্রাহ্ম মতবাদে দীক্ষা গ্রহণ করেন।
ছাত্রজীবনে তিনি ফারসি ও সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। কেশবচন্দ্র সেন ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর প্রভাবে ১৮৭১ সালে তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন এবং প্রচারব্রত গ্রহণ করে উত্তর ভারত, দক্ষিণ ভারত ও ব্রহ্মদেশ ভ্রমণ করেন। গুরু কেশবচন্দ্র সেনের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি ইসলামি সাহিত্য-সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়েও গিরিশ চন্দ্র সেনই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি কোরআন শরীফের পবিত্রতা রক্ষা করে বঙ্গানুবাদ করার সাহসিকা দেখিয়ে ছিলেন। ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক হিসেবে তাঁকে “ভাই” খেতাবে ভূষিত করা হয়। পরবর্তীতে আরবি, ফার্সি ভাষার ব্যুৎপত্তি অর্জন ও কোরআন হাদিসের প্রথম অনুবাদক হিসেবে তাঁকে “মৌলভি” উপাধি দেওয়া হয়। ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট গিরিশ চন্দ্র সেন মৃত্যুবরণ করেন। গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ি যেতে চাইলে প্রথমে নরসিংদীর পাঁচদোনায় আসতে হবে। ঢাকার গুলিস্থান থেকে মেঘালয় ছাড়াও বেশকিছু পরিবহণের বাস পাঁচদোনার পথে যাতাযাত করে। পাঁচদোনা থেকে সিএনজি কিংবা অটোতে চড়ে ডাঙ্গা বাজার পৌঁছে সেখান থেকে সহজেই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়িতে যেতে পারবেন। আবার মহাখালি থেকে কুড়িল বিশ্ব রোড দিয়ে কাঞ্ছন ব্রিজ পার হয়ে মায়ার বাড়ী মোড় হতে অটো নিয়ে গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ী যাওয়া যায়। এমন আরো ভিডিও ও তথ্য পেতে আমাদের এই পেজ টিকে ফলো করুন এবং লাইক কমেন্ট শেয়ার করে পাশে থাকুন ।


