সেই মধ্যযুগ থেকে উনিশ শতকের শুরু পর্যন্ত আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ নিয়ে গোটা অঞ্চলটাই ছিল বৈশ্বিক বস্ত্রবাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। অমসৃণ, মোটা বাফতা থেকে শুরু করে মিহিন মখমল পর্যন্ত তৈরি হয়েছে এই বাংলার গ্রামে গ্রামে, স্থানীয় বুয়ন শিল্পীদের নৈপুণ্যে। টাঙ্গাইল এর নাম মনে পরলেই মনে পরে এই অঞ্চলের শাড়ির কথা । শাড়ি প্রেমি প্রত্যেক নারীর কাছে এই অঞ্চলের জামদানি শাড়ি অনেক পছন্দ এবং প্রায় সবার কাছে একটা করে হলেও আছে এই জামদানি শাড়ি । সুপ্রিয় দর্শক শ্রোতা বৃন্দ আজ কে জানব এই টাঙ্গাইল এর জামদানি শাড়ির ইতিহাস এবং এর আদ্য প্রান্ত ।
নান্দনিক ডিজাইন এবং দামে বেশি হওয়ার কারণে জামদানির সঙ্গে আভিজাত্য এবং রুচিশীলতা – এই দুটি শব্দ জড়িয়ে আছে। প্রাচীন আমল থেকে এ দেশের কৃষির পর গ্রামীণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ভিত ছিল তাঁতশিল্প। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত রিহলাতে বাংলার তাঁতবস্ত্রের কথা উল্লেখ করেন। ইবনে বতুতার এ ভ্রমণবৃত্তান্ত ছিল ১৪ শতকের। এ থেকে ধারণা করা যায়, এ অঞ্চলের তাঁতের বয়স কত প্রাচীন। জামদানি হল কার্পাস তুলা দিয়ে প্রস্তুতকৃত একধরনের পরিধেয় বস্ত্র যার বয়ন পদ্ধতি অনন্য । একটি মত অনুসারে ‘জামদানি’ শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। ফার্সি জামা অর্থ কাপড় এবং দানা অর্থ বুটি, সে অর্থে জামদানি অর্থ বুটিদার কাপড়। একারণে মনে করা হয় মুসলমানেরাই ভারত উপমহাদেশে জামদানির প্রচলন ও বিস্তার করেন। আরেকটি মতে, ফারসিতে জাম অর্থ এক ধরনের উৎকৃষ্ট মদ এবং দানি অর্থ পেয়ালা। জাম পরিবেশনকারী ইরানি সাকীর পরনের মসলিন থেকে জামদানি নামের উৎপত্তি ঘটেছে। জামদানি বুননকালে তৃতীয় একটি সুতা দিয়ে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। মসলিন বয়নে যেমন ন্যূনপক্ষে ৩০০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করা হয়, জামদানি বয়নে সাধারণত ২৬-৮০-৮৪ কাউন্টের সূতা ব্যবহৃত হয়।

বাংলার এ নিজস্ব পোশাক তৈরির ঐতিহ্যের রক্ষাকবচে প্রথম আঘাত আসে ব্রিটিশ আমলে। সে সময় ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারের মেশিনে তৈরি কাপড়ের প্রসার ঘটে এ অঞ্চলে। তবে ১৯০৬ সালে মহাত্মা গান্ধী স্বদেশি আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের মেশিনে তৈরি কাপড়ের বর্জনের ডাক দিলে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলার তাঁতবস্ত্র। সে সময়টাতে পুরান ঢাকাসহ সোনারগাঁ ও আশপাশের অঞ্চল থেকে তাঁতশিল্পের প্রসার ঘটে টাঙ্গাইলসহ আরও অনেক জায়গায়। ঐতিহাসিকভাবে টাঙ্গাইল শাড়ির তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের তাঁতিরা। পরে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হন মুসলিমরাও। তবে টাঙ্গাইলের পাথরাইল ইউনিয়নের হিন্দুদের বসাক সম্প্রদায়ের অবদান আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হওয়ার ভীতি, কাঁচামালের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া, সরকারের কাছ থেকে ঋণ না পাওয়া, পণ্য পরিবহনে সংকট, ব্যবসায়িক নিরাপত্তার অভাবের কারণে হিন্দু তাঁতিরা ধীরে ধীরে এ দেশ থেকে ভারতে অভিবাসী হন।

দেশভাগ ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর এ অভিবাসনে বড় ধাক্কাটি আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর। ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল শাড়ির পাশাপাশি সুন্দরবনের মধুরও জিআই স্বত্ব পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বতন্ত্র একটি ভৌগোলিক পণ্যের স্বত্বাধিকারী আরেকটি দেশ কীভাবে হয়? ঐতিহাসিকভাবে আসলে টাঙ্গাইল শাড়ি ভারতীয় পণ্য হওয়ার কি আদৌ কোনো সুযোগ আছে? ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল শাড়ির পাশাপাশি সুন্দরবনের মধুরও জিআই স্বত্ব পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বতন্ত্র একটি ভৌগোলিক পণ্যের স্বত্বাধিকারী আরেকটি দেশ কীভাবে হয়? ঐতিহাসিকভাবে আসলে টাঙ্গাইল শাড়ি ভারতীয় পণ্য হওয়ার কি আদৌ কোনো সুযোগ আছে? আসুন জানি জিআই স্বত্ব কি কেনো এটি এত গুরুত্বপূর্ণ ? কোনো একটি দেশের নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মাটি, পানি, আবহাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানকার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাহলে সেটিকে সেই দেশের জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কোনো একটি পণ্য চেনার জন্য জিআই স্বীকৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জিআই স্বীকৃতি পাওয়া পণ্যগুলো অন্য দেশের সমজাতীয় পণ্য থেকে আলাদাভাবে চেনা যায়। এর ফলে ওই পণ্যের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। ঐতিহাসিকভাবে এ শাড়ির উৎপত্তিস্থল টাঙ্গাইল নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর প্রেক্ষাপট অনেকটাই পরিবর্তন হওয়ার পরই মূলত বিতর্ক শুরু হয়। টাঙ্গাইল শাড়ির মূল কারিগর বসাক সম্প্রদায়ের বড় অংশই দেশভাগের পর ভারতে চলে যান। পাকিস্তান পর্বে তো বটেই, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরেও বসাক সম্প্রদায়ের পরিবারের সংখ্যা ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে। তাঁরা মূলত নদীয়া জেলার ফুলিয়া এবং পূর্ব বর্ধমানের ধাত্রী ও সমুদ্রগড় এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তাঁদের বদৌলতে নদীয়া ও পূর্ব বর্ধমানে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু উৎপত্তিস্থল টাঙ্গাইলের নাম ধারণ করার পরও ভৌগোলিকভাবে অন্য স্থানের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না?


