তাবলীগ জামায়াত, যা হলো ধর্মপ্রচারকদের সমাজ, আরব বিশ্বে আহবাব নামে পরিচিত, তাবলীগ হলো একটি ইসলাম ধর্মভিত্তিক সংগঠন ও ধর্মপ্রচার আন্দোলন, যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা, এবং যা মুসলিমদেরকে ও নিজ সদস্যদেরকে ধর্মচর্চায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করে, যেভাবে ইসলামের নবী মুহাম্মদের (স.) জীবদ্দশায় তা চর্চা করা হতো। বিশ্বজুড়ে সংগঠনটির আনুমানিক ১.২ কোটি থেকে ৮ কোটি অনুগামী রয়েছে। একে “২০-শতকের ইসলামের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মীয় আন্দোলন গুলোর মধ্যে অন্যতম” হিসেবে গণ্য করা হয়।
সুপ্রিয় দর্শক কেন হয়েছে তাবলিগ জামায়েতের বিভক্তিসহ আরো কিছু ইতিহাস।
১৯২৬ সালে মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভি কর্তৃক ভারতের মেওয়াতে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি দেওবন্দি আন্দোলনের একটি শাখা হিসেবে এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয়কে অবজ্ঞা ও নৈতিক মুল্যবোধের সমসাময়িক অবক্ষয়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাদের যাত্রা শুরু করে। ভারতের হরিয়ানা ও রাজস্থানের উত্তরে জনবিরল এক অঞ্চলের নাম মেওয়াত। সালটা ছিল ১৯১০। উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর জেলার মাজাহির উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী ইসলামি জ্ঞান ‘শূন্য’ কয়েকজনকে পুরোপুরি ইসলামি শিক্ষায় দীক্ষিত করতে তিনি মেওয়াতে ইসলামি শিক্ষার পরীক্ষণ চালান।

পরে ১০ বছরে ওই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এই ধারা। যদিও তা মৌখিক আকারেই বিদ্যমান ছিল।
১৯২০ সালে দক্ষিণ দিল্লির পশ্চিম নিজামুদ্দিন এলাকার এক মসজিদে তাবলিগের মূল কার্যক্রম গড়ে তোলেন ইলিয়াস কান্ধলভী। এটি এখন নিজামুদ্দিন মারকাজ নামে পরিচিত।
১৯২৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো হজে যান মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী। মক্কায় তিনি তাবলিগের নতুন কর্মপদ্ধতির বিষয়ে পরিকল্পনা করেন। এবং তিনি নতুন কর্মপদ্ধতি চালু করেন। এর মধ্যে আছে—ছোট ছোট দলে মসজিদের ধর্মীয় পরিবেশে অল্প সময়ের জন্য ইসলামি শিক্ষা নেওয়া। এর মধ্যে আছে ‘গাশত’, যা দলবদ্ধভাবে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি আহ্বানকে বোঝায়।
অন্যটি ছিল একটি দল ঘর ছেড়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বের হয়ে ইসলামের প্রতি মানুষকে আহ্বান করবে। এভাবেই পরবর্তীতে গড়ে উঠে তাবলিগ জামাতের রূপরেখা।
১৯৪৪ সালে মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার ছেলে প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভীকে তাবলিগের আমির করা হয়। সেসময় প্রথমবারের মতো পাকিস্তানে তাবলিগের আমির নির্বাচিত হন হাজী শফি কুরাইশি। ১৯৪৬ সালে দিল্লি থেকে সৌদি আরবে ও ব্রিটেনে প্রচারণার জন্য কয়েকজন তাবলিগ অনুসারীকে সেখানে পাঠানো হয়।
১৯৪৮ সালে মাওলানা আবদুল আজিজের প্রচেষ্টায় ঢাকায় তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মাওলানা আবদুল আজিজ ছিলেন বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের প্রথম আমির।
১৯৪১ সালে দিল্লির নিজামুদ্দিনে এক বার্ষিক আলোচনা সভায় প্রায় ২৫ হাজার তাবলিগ অনুসারী যোগ দেন। এটিকেই বর্তমানের ইজতেমার প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

১৯৪৬ সালে মাওলানা আবদুল আজিজের প্রচেষ্টায় ঢাকার কাকরাইল মসজিদে প্রথমবারের মতো বার্ষিক ইজতেমা আয়োজিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন তাবলিগের বিশ্ব আমির মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভীও।
১৯৫৪ সালে ঢাকায় লালবাগ শাহী মসজিদ ও এর আশপাশের এলাকায় অনুষ্ঠেয় বার্ষিক ইজতেমায় যোগ দেন প্রায় ৫ হাজার মুসল্লি। ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রামের হাজী ক্যাম্পে তাবলিগের ইজতেমা আয়োজিত হয়।
১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আয়োজিত হয় আরও একটি ইজতেমার।
১৯৬০ সালে ঢাকার রমনা উদ্যানে অনুষ্ঠিত ইজতেমাই ছিল প্রথমবারের মতো বড় পরিসরের আয়োজন। যেখানে যোগ দিয়েছিলেন প্রায় ১৫ হাজার মুসল্লি। এরপর ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে রমনায় বার্ষিক ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৬৫ সালে রমনায় অনুষ্ঠেয় ইজতেমায় সমাগম হয় প্রায় ২৫ হাজার মুসল্লির। সেখানে স্থান সংকুলান সম্ভব হয়নি। ইজতেমায় মুসল্লি ও অনুসারীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে রমনার পরিবর্তে গাজীপুরের টঙ্গীতে তুরাগ নদের তীরে পাগার গ্রামের খেলার মাঠে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় বার্ষিক ইজতেমার।
মহান মুক্তিযুদ্ধের পর তথা ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টঙ্গীতে তুরাগের তীরবর্তী বিস্তীর্ণ ও সুবিশাল পাগার গ্রামের মাঠ তাবলিগ জামাতের বাৎসরিক ইজতেমার জন্য বরাদ্দ দেন। এর পরের বছর থেকে খেলার মাঠটি ছাড়াও তুরাগের উত্তরপূর্ব তীরে ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু এলাকা ও রাজউকের হুকুমদখলের ১৬০ একর বিশাল ময়দানে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
তাবলিগ জামাতে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ও বর্তমান অবস্থা
ভারতে মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভীর হাতে সৃষ্ট তাবলিগ জামাত শুরু থেকেই ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছিল কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে। বাংলাদেশেও সেভাবেই এর সূচনা হয়। তাবলিগ জামাতে মাদ্রাসা শিক্ষক ও ছাত্রদের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।
১৯৯৫ সালে মাওলানা ইনামুল হাসান কান্ধলভী মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তাবলিগের ১০ সদস্যকে নিয়ে শুরা ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন। যেন তার অনুপস্থিতিতে শুরা সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটি ২০১৫ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল।
২০১৫ সালে তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভীর প্রপৌত্র মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব আমির করা হয়।
২০১৭ সালে মাওলানা সাদ কান্দলভীর কয়েকটি বিবৃতি দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারীদের বিরুদ্ধে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার মুফতি ইব্রাহিম দেসাই এই বিষয়ে ‘আস্কইমাম’ ওয়েবসাইটে ফতোয়া দেন। এতে মাওলানা সাদের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
২০১৮ সালে তাবলিগ জামাতের মধ্যে ২ পক্ষের সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব শুরু হয় দিল্লির নিজামুদ্দিনে। মাওলানা সাদ কান্দলভীকে নিয়ে এই দ্বন্দ্বে পৃথক হয়ে পড়েন তাবলিগের অনুসারীরা। মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে পৃথক ফতোয়া দিয়ে বৈশ্বিকভাবে দারুল উলুম দেওবন্দের নীতি অনুসরণ করা হয় কওমি ও দেওবন্দী মাদ্রাসাগুলোয়। এই দ্বন্দ্বের রেশ এসে পড়ে বাংলাদেশেও।
দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসরণে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার অনুসারীরাও মাওলানা সাদের বিপক্ষে অবস্থান নেন। তারা মাওলানা সাদকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ২ ভাগে বিভক্ত তাবলিগের অনুসারীরা ২ পর্বে ইজতেমার আয়োজন করে আসছেন।


