নিভে গেলো কোটি মানুষের আশার আলো । বাংলাদেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আজ মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তিকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে নিহত হন। নেতৃত্বের ষড়যন্ত্রে বিএনপি পড়ে যায় অথই সাগরে। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন। খালেদা জিয়া প্রথমে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, আর শেষে চেয়ারপারসন হন। তখন তাঁর বয়স ছিল চল্লিশের নিচে।
শুরু হয় নতুন নেতৃত্বে বিএনপির পথচলা। ১৯৬০ সালেই কলেজপড়ুয়া বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাডেট অফিসার জিয়াউর রহমানের বিয়ে হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস বেগম খালেদা জিয়া দুই সন্তানসহ গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার সংহতি ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে শহীদ হন। সে সময় খালেদা জিয়া ছিলেন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। দুই সন্তান নিয়ে তখন ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত এবং দিশাহারা। জিয়াউর রহমানের পর দলের হাল কে ধরবেন, সেটি নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে।

১৯৮২ সালে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ১৯৮৩ সালে স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নামেন খালেদা জিয়া। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ৭–দলীয় ঐক্যজোট। বিএনপির দায়িত্ব নেওয়ার পরই নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েন খালেদা জিয়া। দল ঐক্যবদ্ধ রেখে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে কোনো রকম সমঝোতা না করেই আপসহীন আন্দোলন করে গেছেন। মূলত তাঁর নেতৃত্বই এরশাদের পতনে মুখ্য ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’র পরিচিতি পান। ’৯০-এর গণ-আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় জনসমর্থন পেয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। খালেদা জিয়া দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। পরে আরও দুবার তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম গ্রহণ করেন। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে ছিলেন তৃতীয়। ছোটবেলায় তাঁর ডাক নাম ছিল পুতুল। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ফেনীর বর্তমান পরশুরাম উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও দুইবারের বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ওয়ান-ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। দেশ ছাড়ার জন্য চাপ থাকলেও দেশ ছাড়েননি তিনি। খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের ওপর বড় ঝড় আসে ২০০৭ সালের এক-এগারোর পর। সে সময় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে। খালেদা জিয়া, তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেসময় বিএনপিকে ভাঙার, খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার নানা চেষ্টা করা হয়। এমন একটি পটভূমিতে ২০০৭ সালে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কানাঘুষা শোনা যাচ্ছিল যে খালেদা জিয়া দেশত্যাগ করবেন, সৌদি আরবে যাবেন। এর আগে ৮ মার্চ তারেক রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি মুষড়ে পড়েন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনেকে গা ঢাকা দেন। ২২ এপ্রিল রাতে বিএনপির তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার আ স ম হান্নান শাহ সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানিয়ে দেন যে খালেদা জিয়া সৌদি আরবে যাবে না। তিনি যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে প্রস্তুত, তবু দেশ ছাড়বেন না। এরপর বিগত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। জেলও খাটতে হয়েছে তাকে। কিন্তু আপস করেননি। কারাগারে থাকাবস্থায় খালেদা জিয়াকে স্লো পয়জনিং করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন বিএনপি নেতারা। আওয়ামী লীগ আমলে তাকে মুক্তি দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে বিএনপি ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার আবেদন জানানো হলেও তাতে সরকার সাড়া দেয়নি। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাকে মুক্তি দেন।


