নোয়াখালী জিলা স্কুল’ বৃহত্তর নোয়াখালী, এমনকি বাংলাদেশের মধ্যে একটি অতি পুরাতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পুরাতন নোয়াখালী শহরে বর্তমান কালিতারা বাজারের নিকট ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৫০ সালে মি. জোনস নামক একজন সরকারি কর্মকর্তা কোনাে রকম সরকারি অনুদান ছাড়াই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। একসময় ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরােপীয় ধারার শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এর প্রেক্ষিতে তারা একটি নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। এই নীতির আলোকে প্রত্যেক জেলা সদরে একটি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু নোয়াখালী জেলায় নতুন কোন স্কুল তৈরি না-করে জোনস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্কুলকে জাতীয়করণ করে এবং নোয়াখালী জিলা স্কুল নামে নামকরণ করা হয়। ১৯২০ সালে প্রমত্তা মেঘনা স্কুলের নিকটবর্তী এলাকা পর্যন্ত চলে আসে। ফলে বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়। তাই স্কুলটি মহব্বতপুর গ্রাম মন্তিয়ার গােনায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর স্কুলের শেষ রক্ষা হয়নি। এ সময়ে শক্তিশালী মেঘনার করাল গ্রাসে স্কুলেটি হারিয়ে যায়। গ্রিক পুরাণের রূপকথার পাখির মতো, ১৯২৩ সালে ‘আর কে জুবলী স্কুলে এটি তার নতুন জায়গা খুঁজে পায়। আর কে জুবলী স্কুলটি মি. রায় রাজ কুমার দত্ত বাহাদুর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ছিল। তিনি হরিনারায়ণপুরের জমিদার ছিলেন। পরে আর. কে. জুবিলী স্কুল নোয়াখালী জিলা স্কুলের সাথে একীভূত হয় এবং আর কে নোয়াখালী জিলা স্কুল’ নামে নতুন। নামকরণ করা হয়।
তদানীন্তন পাকিস্তান আমলের কিছু সময় ‘আর কে; নামটি ছিল। মেঘনা নদী আবার তার রুদ্রমূর্তি ধারন করে। ফলে তৃতীয়বারের মতো স্কুল ১৯৩১ সালে পুনরায় তার অস্তিত্ব হারানাের কবলে পড়ে। সুসজ্জিত একাডেমিক ভবনটি নদীতে নিমজ্জিত হয়। তারপর আহমদিয়া হাই মাদ্রাসা নামক নতুন ধারার মাদ্রাসায় স্কুলটি স্থানান্তরিত হয়। ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারের জন্য ব্রিটিশ সরকার শিক্ষানীতির আলােকে এ-ধারার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। ঐ সময় কিছু দিনের জন্য ‘নোয়াখালী জিলা স্কুল এখানে সকালবেলায় পরিচালিত হতো। কিন্তু হায় !!! মেঘনা তার অবিরাম ভাঙনের দ্বারা এ-মাদ্রাসাটিকেও গিলে ফেলে। তারপর এটি বঙ্গ বিদ্যালয় নামক স্কুলে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৪৮ সালে মেঘনা আবার পূর্ণ শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়।
বাংলাদেশের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব এ-স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন। যা লিখে শেষ করা যাবেনা।


এখানে স্কুল সম্পূর্ণরূপে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, মেঘনার এমন তাণ্ডবে ১৯২০ সালে নোয়াখালী শহর বর্তমান অবস্থানে সরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এবং সে লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত শহর স্থানান্তরের কারণে স্কুল সরানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। সোনাপুর রেল স্টেশনের নিকটে কারামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসা এটি সকালের পালায় পরিচালিত হত। শুরুতে ‘নোয়াখালী জিলা স্কুল ছিল তৃতীয় শ্রেণি থেকে। কিন্তু স্থানাভাবে এখানে দুটি ক্লাস বাদ দিয়ে পঞ্চম শ্রেণি থেকে এটি পরিচালিত হয়। কিছুদিনের মধ্যে বর্তমান স্থানে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণকৃত জায়গায় প্রায় সাত একর ভূমির ওপর স্কুলটি নতুন ঠিকানা খুঁজে পায়। এটি ছিল ইংরেজি L-সাইজের বাঁশের বেড়া ও টিনের চালা-দেয়া ভবন। সম্ভবত অস্থায়ী ভিত্তিতে এমন ভবন তৈরি করা হয়েছিল বলে সবার ধারণা। কারণ শহরটি চৌমুহনী বা ফেনীতে সারানোর জোরালো সম্ভাবনা ছিল। এজন্য চৌমুহনী এবং ফেনীতে তদানীন্তন বঙ্গীয় সরকার প্রচুর জায়গা অধিগ্রহণ করে। শেষপর্যন্ত বর্তমান অবস্থানে সরকার বাহাদুর ফুলের নামে জমি বরাদ্দ দেয়। উল্লেখ করার অবকাশ থাকে না যে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মি.আজম খান নোয়াখালী শহরকে বর্তমান অবস্থানে থাকার জন্য বিশেষ অবদান রাখেন। পাকিস্তান আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খুব বেশি হয়নি। এ সময়ে নতুন বিজ্ঞান ভবন ও একটি ছােট অডিটোরিয়াম তৈরি হয়। স্বাধীনতার কিছু আগে একটি একাডেমিক ভবন, হােস্টেল এবং প্রধান শিক্ষকের ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। অনেক পরে ১৯৭৫-৭৬ সালে এগুলাে হস্তান্তর করা হয়।
বিজ্ঞাপন



