টেম্স নদী । লন্ডন এ গিয়েছেন বা লন্ডন সম্পর্কে জানেন কিন্তু টেমস নদীর নাম শুনেন নাই, এমন মানুষ খুজে পাওয়া যাবে না । এই টেমস্ নদীর এই তীর ঘেসেই লন্ডন শহর অবস্থিত। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫ জুলিয়াস সিজার যখন ইংল্যান্ড এর রোমান দের আক্রমণ করতে যাবেন তার এই যাত্রা পথে বাঁধা হয়ে দারায় এই নদী তখন তিনি এই নদীর নাম দেন টেমেসেস । ইংল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এই নদী । এই নদীর উৎপত্তি ঘটেছে টেম্স উপত্যকা থেকে । উপত্যকাটি অক্সফোর্ড, পশ্চিম লন্ডন এবং টেম্স গেটওয়ের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এই উপত্যকাকে কেন্দ্র করেই টেম্স প্রবাহিত হয়ে চলেছে । যার আয়তন ৩৪৬ কিলোমিটার বা ২১৫ মাইল । সুন্দর এই টেমস্ নদীর দুই তীর কে একত্রিত করেছে লন্ডন ব্রিজ । যা লন্ডন শহর এবং সাউথওয়ার্কের কে এক সাথে মিলিয়েছে ।
এটি প্রথম স্থাপন করেছিলেন রোমান প্রতিনিধিরা ৫০ খ্রিস্টাব্দে । তখন এই ব্রিজ ছিলো কাঠের তৈরি । বর্তমানে এটি কংক্রিট আর ইস্পাতের তৈরি , যা ১৯৭৩ সালে খুলে দেয়া হয় যাতায়াত এর জন্য । এই নদী টি আগে ও এত সুন্দর ছিল । সভ্যতা ও মানুষের বিবর্তনে এই নদীর তীরে গড়ে উটে নানা ধরনের কলকারখানা যার ময়লা ও পানি দিনের পর দিন দূষিত করতে থাকে এই নদী কে । সময়ের বিবর্তনে আবার মানুষের প্রয়োজনেই, এই নদীকে করে তুলেছে পরিস্কার নদীতে। ফিরে পেয়েছে তার সেই চির চেনা সুন্দর রুপ যা দেখতে অনেক মানুষ ভিড় জমায় এই নদীর তীরে । টেম্স ও বুড়িগঙ্গা এই দুই নদীর ইতিহাসের মেলবন্ধনও প্রাই একই।


আমাদের বুড়িগঙ্গাও একসময় চকচকে পানি ছিল, যা আমরা যত্র- তত্র ব্যবহার করে দুষিত করে ফেলেছি। কিন্তু টেম্স নদী যেভাবে ফিরে এসেছে আগের রুপে, কিন্তু আমাদের বুড়িগঙ্গা আর আগের রুপেতো ফিরতে পারেইনি বরং প্রতিনিয়ত দূষিত থেকে আরো দূষিত নদীর রেকর্ড করছে। আরো একটি মজার ব্যাপার এ টেম্স নদীর লন্ডন ব্রীজ দু’টি শহরকে একসাত করেছে। তেমনি বুড়িগঙ্গা নদীর উপর থাকা বাবুবাজার ব্রীজও ঢাকার দুটি শহরকে একসাত করেছে।
এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে আমাদের প্রানের শহর ঢাকা । বুড়িগঙ্গা নদী বাংলাদেশের উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি নদী । ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার পানি এক স্রোতে মিশে বুড়িগঙ্গা নদীর সৃষ্টি হয়েছিল। তবে বর্তমানে এটা ধলেশ্বরীর শাখাবিশেষ। কথিত আছে, গঙ্গা নদীর একটি ধারা প্রাচীনকালে ধলেশ্বরী হয়ে সোজা দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে মিশেছিল। পরে গঙ্গার সেই ধারাটির গতিপথ পরিবর্তন হলে গঙ্গার সাথে তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে প্রাচীন গঙ্গা এই পথে প্রবাহিত হতো বলেই এমন নামকরণ। মূলত ধলেশ্বরী থেকে বুড়িগঙ্গার উৎপত্তি। কলাতিয়া এর উৎপত্তিস্থল। বর্তমানে উৎসমুখটি ভরাট হওয়ায় পুরানো কোন চিহ্ন খোঁজে পাওয়া যায় না। এর দৈর্ঘ্য ২৯ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩০২ মিটার এবং নদীটি দেখতে সর্পিলাকার । ৪০০ মিটার প্রশস্ত ও গভীরতা প্রায় ৪০ মিটার এই নদীর ১৯৮৪ সালে পানিপ্রবাহের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯০২ কিউসেক। তবে বর্তমানে বুড়িগঙ্গার পানিপ্রবাহের পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

বুড়িগঙ্গার সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজ করেছিলেন বাংলার সুবাদার মুকাররম খাঁ।

তার শাসনামলে শহরের যেসকল অংশ নদীর তীরে অবস্থিত ছিল, সেখানে প্রতি রাতে আলোক সজ্জা করা হতো। এছাড়া নদীর বুকে অংসখ্য নৌকাতে জ্বলতো ফানুস বাতি। তখন বুড়িগঙ্গার তীরে অপরুপ সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি হতো। ১৮০০ সালে বিলেতি টেইলর সাহেব বুড়িগঙ্গা নদী দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন- “বর্ষাকালে যখন বুড়িগঙ্গা পানিতে ভরপুর থাকে তখন দুর থেকে ঢাকাকে দেখায় ভেনিসের মতো।” তবে বুড়িগঙ্গার আগের ঐতিহ্য এখন আর নেই। কালের বিবর্তনে দখল হয়ে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গার নদীতীর । গড়ে উটেছে না ধরণের অবৈধ কলকারখানা , কাল্ভাট । যার দূষিত পানি দিনের পর দিন বুড়িগঙ্গার পানি কে দূষিত করে ফেলছে । ফলে আগের সেই রুপ হারিয়ে ফেলেছে এই নদীটি । যার জন্য হারিয়ে গেছে নানাবিধ মাছ, হারিয়ে গেছে অনেক প্রানী । হারিয়ে গেছে অনেক মানুষের জীবিকা । আমাদের উচিত এই সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে, নদী সংস্কার করে তার সেই পুরনো রুপ ফিরিয়ে দেয়া ।


